ভালো মার্কসের আত্মকাহিনী! (প্রসঙ্গঃ বাংলা)

ভালো মার্কস কথাটার মানে কী? পাস করা? নিশ্চয় না! কারণ এটা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লড়াই। এখানে প্রথম সারিতেই থাকতে যুদ্ধ করতে হয়। চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ভাল মার্কস মানে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে অন্তত ০.৫ মার্কস হলেও বেশি পাওয়া।
বাংলার ব্যাকরণ অংশে প্রায় সবার ভাল প্রস্তুতি থাকেও থাকাটা বাঞ্চনীয়। এখানে শুদ্ধ হলেই ভাল মার্কস আসে। সাহিত্য বিষয়ক প্রশ্নের উত্তরে ও প্রায় সবাই সমান দক্ষতা দেখাতে পারে। অশুদ্ধ বাক্য কিংবা ভুল বানান খুবই দৃষ্টিকটু। এ বিষয়ে অবশ্যই নজর দিবেন।
বাংলা লেখার ক্ষেত্রে আপনি যদি লেখায় সাহিত্যের ছোঁয়া আনতে পারেন তবে নিশ্চিত থাকেন আপনার খাতা অন্যদের চেয়ে বেশি মার্কস নিয়ে আসবে। আপনাকে লেখার মধ্য দিয় বুঝিয়ে দিতে হবে আপনি বাংলায় অনার্স/মাস্টার্স করেছেন। সাধারণ লেখা দিয়ে বাংলার শিক্ষকদের সন্তুষ্ট করা যায়না। যেহেতু বাংলায় রচনা ছাড়া বাংলার অন্য কোন জায়গায় আপনি ডাটা,গ্রাফ,পরিসংখ্যান, চার্ট ইত্যাদি দিতে পারছেন না, সুতরাং চেষ্টা করবেন প্রতিটি প্রশ্নে যেন মধুর কিছু কথা দিয়ে শিক্ষকের মন ভোলানো যায়। কারণ ডাটা,গ্রাফ,পরিসংখ্যান, চার্ট ইত্যাদি দিতে পারলে না হয় মার্কস বাড়ানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু চিঠি/দরখাস্ত, ভাবসম্প্রসারন, কাল্পনিক সংলাপ,গ্রন্থ সমালোচনা / সারাংশ এসব বিষয়ে গ্রাফ,চার্ট দেয়ার মত কিছুই থাকেনা। আর এখানেই আপনাকে ভাষার সুন্দর প্রয়োগ দেখাতে হবে। যেমন ধরুন পরীক্ষায় চিঠি আসল, ৪৩তম বিজয় দিবসে ‘লাখো কন্ঠে সোনার বাংলা ‘ অনুষ্ঠানটির বর্ণনা দিয়ে বিদেশী বন্ধুর কাছে একটি পত্র লিখুন।
:
কিভাবে শুরু করবেন? শুরুতেই এমন কিছু লিখতে হবে যেন তা গতানুগতিক হয়ে না যায় এবং লেখাটার প্রথম লাইন পড়েই শিক্ষক কিছুটা হলেও মুগ্ধ হয়ে যায়, এছাড়া আপনার খাতাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা মুল্যায়ন করার সুযোগ পায়।
এবং প্রথম লাইন পড়েই পরের লাইন পড়ার আগ্রহ জন্মে। চিঠিটা আপনি চাইলে এভাবে শুরু করতে পারেন..
:
প্রিয় হৃদ্য,
“রাতের এই নির্ঝনতায় ঘুমন্ত শহরে ঘর নামক এক কংক্রিটের দেয়ালে জানালার পাশে বসে দখিনা হাওয়ায় আমি লিখছি তোমাকে। এই স্নিগ্ধ শীতল পরিবেশের অনাবিল শুভেচ্ছা তোমায়। কী লিখব তোমায়! হয়তো কলমের কিছু আকিঁবুকি কেটে যাব কাগজের সাদা ফ্রেমে। আজ আবেগের জলে সাঁতার কেটে আমি সিক্ত এই ভেবে আমরা বাঙালিরা ৪৩ তম বিজয় দিবসে ‘লাখো কন্ঠে সোনার বাংলা ‘গেয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছি। আজ তোমাকে তার বর্ণনায় কী আর লিখব! আবেগ যখন প্রবল হয় ভাষা তখন অচল হয়ে যায়।…. ”
:
এভাবে আপনি আপনার চিঠিটা লেখা শুরু করতে পারেন। এটা আমি আমার নিজের ভাষায় লিখলাম, আপনি আপনার মত করে গুছিয়ে লিখুন। তবে বাজারের গাইড বইগুলো অনুসরন না করাই ভাল। অধিকাংশ বইতেই শুধু লেখার জন্যই লেখা দেয়া। এর বেশি কিছু নয়। আপনি এর চেয়ে ভাল লিখতে পারেন একটু চেষ্টা করলেই হয়।
:
এরপর আসুন গ্রন্থ সমালোচনায়। এখানে ও আপনি সাহিত্যের ছোঁয়া নিয়ে লিখতে পারলে মার্কস অবশ্যই অন্যদের চেয়ে অনেক বাড়বে। গতানুগতিক বইয়ের মত তো সবাই লিখবে ;আপনি না হয় ভিন্ন কিছু করুন। ধরুন পরীক্ষায় আসল, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “গৃহদাহ “উপন্যাসটির গ্রন্থ সমালোচনা লিখুন। এক্ষেত্রে আমি হলে যা লিখতাম তা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।
:
“উপন্যাসের নামঃ গৃহদাহ
লেখকঃ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্যে যে ক’জন লেখকের ক্ষুরধার লেখনীতে, শব্দশৈলী আর বাক্যের চারুময়তা পাঠক হৃদয়ে ভাবনার জগতে নতুন এক বারান্দা সৃষ্টি করে, তাদের অন্যতম অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সমাজে ঘটমান বিভিন্ন বিষয়কে তিনি কলমের মাথায় কালির স্পর্শে সাদা পৃষ্ঠায় বন্দি করে এক অনবদ্য মুগ্ধতা দিয়ে আলোড়িত করেছেন পাঠকচিত্তে। ‘গৃহদাহ’ তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। প্রেমের বেড়াজালে হৃদপিন্ডের প্রকোষ্ঠে জন্ম নেওয়া ভালো লাগা, অতঃপর ভালবাসার এক সুনিপুন কাহিনী তৈরী হয়েছে অচলা চরিত্রটি ঘিরে। “……. এভাবে লেখাটা শুরু করে বাকি অংশ শেষ করতে পারেন। কিন্তু বাজারের গাইড বইগুলো খুলে দেখবেন এখানে গ্রন্থ সমালোচনা করতে গিয়ে প্রায় পুরো কাহিনীটা তুলে দিয়ে কিছু গতানুগতিক কথা দিয়ে শেষ করেছে। আপনি বই পড়ে কাহিনীটা বুঝবেন কিন্তু লিখবেন একটু সাহিত্যিক রং মেখে নিজের ভাষায়। এক্ষেত্রে আমার উপরের লেখাটার মতই হতে হবে এমনটি নয়। আমি নিজের ভাষায় বেশ কয়েকটা গ্রন্থ সমালোচনা দিয়েছিলাম সেগুলো চাইলে দেখতে পারেন। আপনি চাইলে আমার লেখাটার চেয়ে ও কয়েকগুন ভাল লিখতে পারবেন। শুরুটা ভাল হলে আপনার খাতায় আলাদা নজর পড়বে সম্মানিত শিক্ষকের। “গ্রন্থ সমালোচনা : সত্যজিৎ চক্রবর্ত্তী ” নাম ও শিরোনামে একটা লেখা পূর্বে দিয়েছিলাম। সে অংশে এটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম।
:
কাল্পনিক সংলাপ লেখার ক্ষেত্রে অবশ্যই ৩/৪জনের মধ্যে সংলাপ তৈরি করবেন। এক্ষেত্রে একজন নেতিবাচক চরিত্রের লোক থাকতে পারে। কাল্পনিক সংলাপ যখন ৩ বা তার বেশির মধ্যে হবে, তখন চেষ্টা করবেন, যে বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সেখানে ২ জন বিষয়ের পক্ষে বললে একজন যেন কিঞ্চিৎ বিপক্ষে বলে। তাহলে সেটা ফলপ্রসূ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে। তবে সাবধান হতে হবে যেন সংলাপের সমাপ্তিটা ইতিবাচক হয়। অর্থাৎ সংলাপে অংশগ্রহনকারী সবাই যেন ঐকমত্যে পৌঁছায়। উদাহরণ দিচ্ছি, ধরুন পরীক্ষায় আসল “বর্তমান সরকারের যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রসঙ্গে সংলাপ তৈরি করুন “। এক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে কোনভাবেই যেন আপনার কাল্পনিক চরিত্রগুলোর কেউই সরকারের খুব বেশি বিপক্ষে না যায়। তবে যিনি নেতিবাচক বলবেন, তার কথাগুলো যেন এমন হয় যার পদক্ষেপ সরকার ইতমধ্যে নিয়ে নিয়েছেন বা নেওয়ার প্রক্রিয়াধীন। তাহলে এক্ষেত্র সংলাপের সমাপ্তিটা সরকারের ইতিবাচক ভুমিকা দিয়ে শেষ করতে পারবেন। “কাল্পনিক সংলাপ লেখার বাস্তব কৌশল : সত্যজিৎ চক্রবর্ত্তী ” নাম ও শিরোনামে এই পেজে প্রকাশিত আমার লেখায় আরো বিস্তারিত পাবেন।
:
রচনার ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজনীয় গ্রাফ,চার্ট, তথ্য, মানচিত্র,পরিসংখ্যান,উক্তি ইত্যাদি দিতে হবে। মনে রাখবেন ৩ইঞ্চির একটা চার্ট ১০ইঞ্চি লেখার চেয়েও বেশি কাজ দিবে। অনুবাদের ক্ষেত্রে যিনি যত বেশি মনোযোগী হবেন তিনি তত বেশি অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন। এই জায়গায় একে অপরের মাঝে মার্কসের একটা বড় ব্যবধান হয়ে যায়। লিখিত পরীক্ষায় প্রতি ১মার্কসের জন্য ও যুদ্ধ করতে হয়।
:
[ যারা প্রিলি প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাদের জন্য চমৎকার একটা বইয়ের নাম “শীকর ” (লেখিকা – মোহসিনা নাজিলা) । বইটির সৌজন্য কপি হাতে পাওয়ার পর, বইটি পড়ে মনে হল মনে মনে আমি এতদিন এরকম একটি এক্সক্লুসিভ বইয়ের খোঁজ করছিলাম। বাজারের সকল প্রকাশনীর বইয়ের চেয়ে বাংলা প্রস্তুতির জন্য এটা কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপিত। সহজ প্রশ্ন সবাই পারে,কিন্তু একটু ভিন্ন কাঠামোর
প্রশ্ন আসলেই প্রয়োজন হয় ভিন্ন কাঠামোগত বইয়ের। গতানুগতিক তথ্য যা অন্য বইতে আছে এবং কিছু এক্সক্লুসিভ তথ্য যা অন্য বইতে নেই; এই দুইয়ের মিশ্রণে লেখা বইটি আশা করি আপনার বাংলা প্রস্তুতির শেষ ঠিকানা হবে। ]
________________________

বিশ্লেষণেঃ সত্যজিৎ চক্রবর্ত্তী
[ SATYAJIT CHAKRABORTY ]

Add Comment

Required fields are marked *. Your email address will not be published.

fifteen − nine =