বিষাদ সিন্ধু : একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস

বিষাদ সিন্ধু :- একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস।
রচনা :- মীর মোশাররফ হোসেন।
কাহিনী :-
এ উপন্যাস রচিত হয়েছে উপক্রমণিকা,মহররম পর্ব,উদ্ধারপর্ব,এজিদবধ পর্ব ও উপসংহার সহকারে। প্রতিটি বিভাগ সম্পর্কে সংক্ষেপে উল্লেখ করছি।
উপক্রমণিকা : উপক্রমণিকায় মহানবী (সা.) কর্তৃক তাঁর দুই নাতি ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনের (হোসেনের) শাহাদাতের সংবাদ দেওয়ার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। যখন তিনি এ দুঃসংবাদ তাঁর সাহাবীদের সম্মুখে দেন তখন সাহাবীরা জানতে চান যে,কে এ হত্যাকাণ্ড ঘটাবে। মহানবী (সা.) মু‘আবিয়ার (মাবিয়ার) পুত্র ইয়াযীদের (এজিদের) নাম উল্লেখ করেন। যেহেতু মু‘আবিয়া তখনও বিয়ে করেননি,তাই তিনি এ খবর শোনার পর বিয়ে না করার শপথ করেন। কিন্তু মহানবী বলেন,তাঁর এমন শপথ করা উচিত নয়। পরে মু‘আবিয়া এক কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে এ ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভের জন্য মহানবী (সা.) তাঁকে বিয়ে করার পরামর্শ দেন। যেন কোন সন্তানের জন্ম না হয় সেজন্য মু‘আবিয়া এক বৃদ্ধাকে বিয়ে করেন। কিন্তু এ বৃদ্ধার গর্ভেই ইয়াযীদের জন্ম হয়। মু‘আবিয়া ইয়াযীদকে ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনের নিকট থেকে দূরে রাখার জন্য দামেশকে চলে যান। সময়ের পরিক্রমায় মহানবী (সা.),হযরত ফাতেমা,হযরত আলী ইন্তেকাল করেন। ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন মদীনায় বয়ঃপ্রাপ্ত হন। অন্যদিকে ইয়াযীদ দামেশকে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়।
এরপর থেকেই মহররম পর্ব,উদ্ধার পর্ব ও এজিদ বধ পর্ব এ তিন পর্বে উপন্যাসের মূল ঘটনা উপস্থাপন করা হয়েছে। নিচে সংক্ষেপে এ তিনটি পর্ব সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়া হল।
মহররম পর্ব : এ পর্বের বিষয়বস্তু হল ইমাম হাসানের সাথে ইয়াযীদের বিরোধ,ইমাম হাসানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা ও কারবালায় ইমাম হুসাইনকে হত্যা। বিষয়গুলো নিম্নরূপ :
আবদুল জব্বারের স্ত্রীর নাম জয়নাব। খুবই রূপবতী। মু‘আবিয়ার পুত্র ইয়াযীদ তাকে দেখে মুগ্ধ হয় এবং তাকে বিয়ে করতে চায়। ইয়াযীদের মা মারওয়ানের সাথে পরামর্শ করে এবং প্রলোভন দেখিয়ে জয়নাবের সাথে আবদুল জব্বারের বিচ্ছেদের ব্যবস্থা করে। আবদুল জব্বার জয়নাবকে তালাক দেয়। এরপর ইয়াযীদ জয়নাবের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে দূত প্রেরণ করে। পথিমধ্যে এ দূতের সাথে ইমাম হাসানের সাক্ষাৎ হয়। ইমাম হাসান জয়নাবের কাছে তাঁর পক্ষ থেকেও বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য দূতকে অনুরোধ করেন। জয়নাব ইয়াযীদের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে এবং ইমাম হাসানের প্রস্তাব গ্রহণ করে। ইমাম হাসান জয়নাবকে বিয়ে করেন। ইয়াযীদ ক্রোধে ফেটে পড়ে। অন্যদিকে ইমাম হাসানের অপর স্ত্রী জায়েদা জয়নাবকে হিংসা করতে শুরু করে।
ইতিমধ্যে মু‘আবিয়া অসুস্থ হয়ে মারা যান। ইয়াযীদ বাদশাহ হয়। সে মদীনার অধিবাসীদের তার আনুগত্য স্বীকার করার নির্দেশ দেয়। মদীনার অধিবাসীরা তা অস্বীকার করলে ইয়াযীদ মারওয়ানকে মদীনা আক্রমণের জন্য প্রেরণ করে। মদীনার সেনাদলের সাথে মারওয়ানের সেনাদলের যুদ্ধ হয় এবং মারওয়ান পরাজিত হয়। পরে মারওয়ান মায়মুনা নামের এক বৃদ্ধার সাথে ইমাম হাসানকে হত্যার ব্যাপারে ষড়যন্ত্র করে। মায়মুনা ইমাম হাসানের স্ত্রী জায়েদার মাধ্যমে বিষ প্রয়োগে ইমাম হাসানকে হত্যা করে। ইমাম হুসাইন এ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন।
এদিকে কুফার শাসক উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ (আবদুল্লাহ জেয়াদ) ধোঁকা দিয়ে ইমাম হুসাইনকে বন্দী করার জন্য বাহ্যিকভাবে ইমাম হুসাইনকে নেতা বলে স্বীকার করে এবং তাঁকে কুফায় আসার আহ্বান জানিয়ে পত্র প্রেরণ করে। ইমাম হুসাইন কুফার অবস্থা যাচাইয়ের জন্য মুসলিম ইবনে আকীলকে প্রেরণ করেন। মুসলিম কুফার ব্যাপারে ইতিবাচক পত্র প্রেরণের পর ইমাম ছয় হাজার সৈন্য নিয়ে কুফার দিকে রওয়ানা হন। পথে তিনি মুসলিমের শাহাদাতের খবর পান। মুহররম মাসের আট তারিখে ইমাম হুসাইন কারবালার প্রান্তরে পৌঁছেন। এখানে ইয়াযীদের সেনাবাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হন। তারা ফোরাত নদীর পানি বন্ধ করে দেয়। ইমামের পরিবার ও সাথীরা ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েন। এ অবস্থার মধ্যেও ইমাম হুসাইন তাঁর মেয়ে সাকীনার সাথে ইমাম হাসানের ছেলে কাসেমের বিয়ে দেন। অবশেষে মুহররমের দশ তারিখে ইয়াযীদের সেনাদলের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ইমাম হুসাইন তাঁর সকল সঙ্গী-সাথীসহ শাহাদাত বরণ করেন।
উদ্ধার পর্ব : এ পর্বের বিষয়বস্তু হল ইমাম হুসাইনের পরিবারের বন্দী হওয়া,ইয়াযীদের দরবারে ইমাম হুসাইনের পবিত্র মাথা নিয়ে যাওয়া এবং এর অদৃশ্য হয়ে যাওয়া,মুহাম্মাদ ইবনে হানাফীয়ার (মোহাম্মদ হানিফার) দামেশক আক্রমণ ও ইমাম যায়নুল আবেদীনের বন্দীদশা থেকে পালিয়ে যাওয়া। যা সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণিত হল।
কারবালার হত্যাকাণ্ডের পর নবী পরিবারের তাঁবুতে ইয়াযীদের সৈন্যরা আক্রমণ করে। মারওয়ান নবী পরিবারের সদস্যদের বন্দী করতে এলে ইমাম হুসাইনের মেয়ে সাকীনা আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে শিমার পুরস্কারের লোভে ইমাম হুসাইনের কাটা মাথা নিয়ে দামেশকের দিকে রওয়ানা হয়। পথিমধ্যে রাত হলে সে আজর নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেয়। আজর সীমারের নিকট থেকে নিহত ব্যক্তির পরিচয় জানতে পেরে তাকে পরামর্শ দেয় যেন সে তা তার হেফাজতে রাখে যাতে রাতে কেউ তা চুরি করে নিয়ে যেতে না পারে। শিমার এতে রাজি হয়। আজর তার পরিবারের সদস্যদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেয় যে,এ মাথা তারা কারবালায় নিয়ে যাবে এবং সেখানে দাফন করবে। পরদিন সকালে শিমার তার নিকট থেকে মাথা চাইলে সে তা দিতে অস্বীকার করে। কিন্তু শিমার একটি কাটা মাথা হলেই চলে যাবে এ কথা বললে আজর প্রথমে তার বড় ছেলেকে হত্যা করে মাথা কেটে এনে শিমারকে দেয়। কিন্তু শিমার এ মাথা নিতে অস্বীকার করে আবারও একটি কাটা মাথার কথা বলে। এভাবে এ ব্যক্তি পরপর তার তিন ছেলেকেই হত্যা করে মাথা কেটে শিমারকে দেয়। কিন্তু শিমার মনে করে আজর হয়ত অর্থের লোভে ইমামের মাথা দিতে চাচ্ছে না। অবশেষে শিমার আজরকে হত্যা করে ইমামের মাথা নিয়ে ইয়াযীদের দরবারে উপস্থিত হয়। ইয়াযীদের দরবার হতে সেই মাথা ঊর্ধ্বে উঠে যেতে যেতে একসময় অদৃশ্য হয়ে যায়।
অপরদিকে ইমাম হুসাইনের বৈমাত্রেয় ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানাফীয়া এ সময় আম্বাদ নগরীর রাজা ছিলেন। হযরত আলী হযরত ফাতিমার অজ্ঞাতসারে এক নারীকে বিয়ে করেন যাঁর গর্ভে মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়ার জন্ম হয়। তিনি কারবালায় ইমাম হুসাইনের আগমন ও সেখানে তাঁর অবরুদ্ধ হবার কথা জানতে পেরে সৈন্যসহ বের হন। কিন্তু তিনি পথিমধ্যে সংবাদ পান যে,ইমাম হুসাইন শহীদ হয়েছেন এবং নবী পরিবার দামেশকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া তাই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে প্রথমে মদীনা অভিযানে বের হন এবং তা দখল করে নেন। তিনি শিমারকে শাস্তি দেন। এরপর দামেশক অভিমুখে যাত্রা করেন। দামেশকে ইয়াযীদের সেনাবাহিনীর সাথে তাঁর যুদ্ধ শুরু হয়। ইতিমধ্যে ইমাম যায়নুল আবেদীন বন্দীদশা থেকে পালিয়ে যান।
এজিদ বধ পর্ব : এ পর্বের বিষয়বস্তু হল ইয়াযীদের পলায়ন ও গুপ্তপুরীতে প্রবেশ এবং মুহাম্মাদ ইবনে হানাফীয়ার বন্দীত্ব। নিচে এ বিষয়গুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করা হল।
মুহাম্মাদ ইবনে হানাফীয়ার সেনাদলের সাথে ইয়াযীদের সেনাদলের প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। ইয়াযীদের বাহিনী পরাজিত হয় এবং ইয়াযীদ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। মুহাম্মাদ ইবনে হানাফীয়া তার পশ্চাদ্ধাবন করেন। অনেক চেষ্টার পরও তিনি ইয়াযীদকে ধরতে ব্যর্থ হন। ইয়াযীদ দামেশকের রাজপ্রাসাদের পাশে একটি ভূগর্ভস্থ গুপ্তপুরীতে প্রবেশ করে। তাকে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় যুদ্ধ শেষেও হানাফীয়ার ক্রোধ থেকে যায়। তিনি অনেককে হত্যা করেন। এ অপরাধে তাঁর জন্য গায়েবী শাস্তি অবতীর্ণ হয়। অত্যুচ্চ প্রস্তরময় প্রাচীর তাঁকে ঘিরে ফেলে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তিনি সেখানে বন্দী থাকবেন।
উপসংহার : এ অংশে ইমাম যায়নুল আবেদীনের সিংহাসনে আরোহণ,নবী পরিবারের মুক্তি ও ইমামের সপরিবারে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে।

পবন চৌধুরী

Add Comment

Required fields are marked *. Your email address will not be published.

five × 5 =