প্রাগৈতিহাসিক | মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

সংক্ষিপ্ত কাহিনী :- “প্রাগৈতিহাসিক ” মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি ছোট গল্প। গল্পটি আবর্তিত হয় “ভিখু” নামে এক দস্যুকে কেন্দ্র করে। ডাকাতি, খুন, ধর্ষন যার একমাত্র জীবিকা। তাকে কখনও পুলিশও জেলে বন্দি রাখতে পারেনি, দু’মাসের মাথায় প্রাচীর টপকিয়ে পালিয়েছে। তাই, পুলিশের কাছে ভিখু ছিল মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল। একদিন রাতে ডাকাতি করতে গিয়ে ভিখুর ১২ জন সঙ্গী নিহত হয়। ভিখু একমাত্র জীবিত, যে পালিয়ে আসতে পারে। ডান কাঁধে বর্শার মারাত্মক আঘাত নিয়ে সে ৯ ক্রোশ পথ পালিয়ে, আহলেদ নামে এক সঙ্গীর কাছে আশ্রয় চায়। কিন্তু, পুলিশের জানাজানির ভয়ে আহলেদ তাকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিতে পারেনা। অথচ, ভিখুর লুট করা স্বর্নের একটা বালা ঠিকই কৌশলে সরিয়ে রাখে। আহলেদ ভিখুকে পাশের জঙ্গলের মধ্যে একটা মাচার উপর রেখে আসে। সেই জঙ্গলেই ভিখু ৩দিন জ্বরে ভোগে, বৃষ্টিতে ভিজে, পিঁপড়ে / জোঁকের কামড় খেয়ে প্রায়ই মুমূর্ষু হয়ে পড়ে। ৩দিন পর আহলেদ তাকে এই অবস্থায় দেখে, তার বাড়িতে গোপনে আশ্রয় দেয়। ক’দিন পর ভিখু একটু সুস্থ হলে, সে আহলেদ এর পরিবারের সাথে এক ঝামেলায় লিপ্ত হয়। ভিখুকে আহলেদ ঘর থেকে বের করে দেয়। ভিখু তখন তার স্বর্নের বালাটা দাবী করে। আহলেদ বালা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে এবং তাকে প্রহার করে। ভিখু সব সহ্য করে সেদিন চলে গেলেও, একদিন রাতে সে আহলেদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং একটি ডিঙ্গি নৌকা চুরি করে অজানা উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

নৌকা একটি সদরে এসে ভীড়ে। দীর্ঘদিনের অভুক্ত, দূর্বল ও ডানহস্ত অচল এককালের ডাকাত সর্দার ভিখু উপায়ন্তর না দেখে জীবিকার প্রয়োজনে বেছে নেই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন পেশা “ভিক্ষা”। নিঃসঙ্গ ভিখুর এইভাবেই কোনোরকমে চলে যায়। কিন্তু নারীসঙ্গহীণ ভিখু সর্বদায় অনুভব করে একজন নারীর অভাব। সেই শহরেই “পাঁচি ” নামে এক ভিখারিনীর সাথে তার পরিচয় হয়। যার একপায়ে বিশাল ক্ষত। ভিখু পাঁচি’র পায়ের ক্ষত সারানোর জন্য ওষুদ দিতে চায়। কিন্তু, পাঁচি উৎসাহবোধ করেনা, কারন এই ক্ষতই তার আয়ের উৎস। ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও সে ভিখুকে বিশ্বাস করতে পারেনা। এভাবেই বর্ষা শেষে শীত আসে, ঋতু বদলায়। ভিখু একদিন পাঁচি’র পায়ের ক্ষত মেনে নিয়ে তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু, ততদিনে বশির নামে এক পা’হীন ভিক্ষুক পাঁচিকে ঘরে তুলে নেয়। ভিখু পাঁচিকে নিয়ে পালাতে চায়। কিন্ত, পাঁচি আগ্রহ বোধ করেনা। বশিরও ভিখুকে অপমান করে। পাঁচির আশেপাশে আসতে নিষেধ করে। ভিখুকে প্রাণনাশের হুমকিও দেয়। ভিখুর এই অপমান সহ্য হয়না। তাই, একদিন গভীর অন্ধকারে সে বশিরকে ধারালো লোহার শিক্ দিয়ে হত্যা করে। সেই রাতেই সে বশিরের সকল সঞ্চয় লুট করে পাঁচিকে নিয়ে অজানা গন্তব্যের পথে পারি জমায়। পায়ের ক্ষত নিয়ে পাঁচি তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারেনা। ভিখু পাঁচিকে কাঁধে তুলে নেয়। গল্পের শেষ অংশটুকু পড়লেই , মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। শেষ অংশটুকু হুবহু তুলে দিলাম :-
ভিখুর গলা জড়াইয়া ধরিয়া পাঁচী তাহার পিঠের ওপর ঝুলিয়া রহিল। তাহার দেহের ভারে সামনে ঝুঁকিয়া ভিখু জোরে জোরে পথ চলিতে লাগিল। পথে দুদিকে ধানের ক্ষেত আবছা আলোয় নিঃসাড়ে পড়িয়া আছে। দূরে গ্রামের গাছপালার পিছন হইতে নবমীর চাঁদ আকাশে উঠিয়া আসিয়াছে। ঈশ্বরের পৃথিবীতে শান্ত স্তব্ধতা।

হয়তো ওই চাঁদ আর এই পৃথিবীর ইতিহাস আছে। কিন্তু যে ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্রহ করিয়া দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচী পৃথিবীতে আসিয়াছিল এবং যে অন্ধকার তাহারা সন্তানের মাংসল আবেষ্টনীর মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক, পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই, কোনোদিন পাইবেও না।

Add Comment

Required fields are marked *. Your email address will not be published.

eight + eighteen =