দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দি সি

হার না মানা জীবনের গল্প “দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দি সি”
লেখকঃ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

খুব সাধারণ একজন জেলের গল্প হলেও আর্নেস্ট হেমিংওয়ের “দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দি সি” মূলত ঐ জেলের হার না মানা জীবনেরই গল্প । আর্নেস্ট হেমিংওয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই উপন্যাসিকাটি লিখেন ১৯৫১ সালে এবং এটি প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে । ১৯৫৩ সালে এটি জিতে নেয় পুলিৎজার পুরস্কার । অন্যদিকে যখন ১৯৫৪ সালে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান তখন নোবেল কমিটিও তাঁর রচিত এই উপন্যাসিকাটির নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করে । ১৯৫২ সালের প্রথম সংস্করণেই বইটি ছাপা হয় ৫০,০০০ কপি । ১৯৫৮ সালে একটি চলচ্চিত্র, ১৯৯০ সালে একটি মিনি-সিরিজ এবং ১৯৯৯ সালে একটি স্বল্প-দৈর্ঘ্যের এনিমেটেড চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের এই গল্প অবলম্বনে । বাংলা ভাষায় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের “দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দি সি”-এর অনুবাদ করেছেন ফতেহ্ লোহানী । অনূদিত গল্প হিসেবেও ফতেহ্ লোহানীর অনুবাদে গল্পের আবেদন যেন একটুও কমেনি । তবে গল্পের দীর্ঘসূত্রিতা অনেক পাঠকের মনেই উপন্যাসিকাটি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিতে পারে । কারণ এখানে খুব ছোট্ট একটা গল্পকে টেনে অনেক বেশি বড় করা হয়েছে । তবে বিশ্লেষণ ছাড়া এই ধরণের গল্পে আসলে শুধুমাত্র গল্পটি পড়েই এর মর্মার্থ বুঝে উঠা সম্ভব নয় ।
উপন্যাসিকার গল্পটি খুবই সাধারণ । একজন বয়স্ক জেলে যিনি কিউবায় বাস করেন । জেলে জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকে সত্ত্বেও গল্পের প্রথমেই জানা যায় যে তিনি একটানা ৮৪ দিন ধরে একটি মাছও ধরতে পারেননি । কিন্তু উনার কাছে এই ব্যর্থতা আসলে ব্যর্থতা নয় বরং জীবন যুদ্ধের আরেকটি ধাপ মাত্র । উনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন যে উনি অনেক দূরের সাগরের জলে যাবেন যেখানে অনেক বড় বড় মাছ পাওয়া যায় । যেই ভাবা সেই কাজ । পরের দিন ঠিকই বের হয়ে পড়েন দূর সাগরের উদ্দেশ্যে এবং জীবনে দেখা সবচেয়ে বড় মারলিন মাছটি তিনি দেখতে পান এখানে । এই মাছটিকে নিয়েই শুরু হয়ে এবার গল্পের এক নতুন মাত্রা । এই মাত্রায় মাছটিকে ধীরে ধীরে শিকারে পরিণত করা, মাছটি ধরার জন্য জেলেটির ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং শিকার ও শিকারীর মাঝে শিকার চলাকালীন সময়ে গড়ে উঠা এক গল্প বর্ণনা করা হয়েছে ।
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের “দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দি সি” গল্পে প্রধান চরিত্র মাত্র ২টি । অবশ্য মনুষ্য চরিত্র বাদ দিয়ে যদি কোন চরিত্রের কথা উল্লেখ করতে হয় তাহলে চরিত্রের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩টি-তে । উক্ত উপন্যাসিকার প্রধান চরিত্র হল সান্তিয়াগো যিনি কিউবার অধিবাসী এবং পেশায় একজন জেলে । বয়সের ভারে অনেকটা বাঁকা হয়ে এসেছেন তবে তাঁর কিন্তু আছে দুর্দান্ত এক জোড়া চোখ । যে চোখে কোন বার্ধক্য নেই, কোন ক্লান্তি নেই । সান্তিয়াগোর স্ত্রী মারা গিয়েছেন এবং তিনি নিঃসন্তান । দারিদ্রতার চরম সীমায় বাস করার পরেও তিনি যেন জীবনে তৃপ্ত । আর এই তৃপ্তির কারণ সাগর এবং মাছ ধরা সম্পর্কে তাঁর অগাধ জ্ঞান । সে নিজে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এবং আশাবাদী । জানেন জীবন মানেই যুদ্ধ করা, সে যুদ্ধে জয়লাভ করা নয় । তিনি ৮৪ দিন নৌকা নিয়ে বের হয়েছে কিন্তু ধরে আনতে পারেননি একটি মাছও । এই অপবাদে তিনি তাঁর জেলেপাড়ার সবচেয়ে অলক্ষ্মী জেলেতে পরিণত হন । কিন্তু এতকিছুও তাঁকে দমাতে পারেনি । তিনি শিকার করেছেন সবচেয়ে বড় মারলিন মাছ একাই । ৩ দিন একটানা প্রকৃতি এবং নিজের শরীরের সাথে যুদ্ধ করে গিয়েছেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মাছটি শিকার করার জন্য । পরিশেষে সফল না ব্যর্থ হয়েছেন সে বিষয়ে তেমন চিন্তিত ছিলেননা বরং তাঁর জোড়া নীল চোখে ছিল স্বপ্ন । সান্তিয়াগো বাদেও এই উপন্যাসের আরেকটি চরিত্র হল ম্যানোলিন নামের একটি বালক, যে পূর্বে সান্তিয়াগোর নৌকায় কাজ করত । গল্পে এই বালকটিকে দেখা যায় সান্তিয়াগোর ভক্ত হিসেবে । সে সান্তিয়াগোর সেবা-যত্ন করত, তাঁর খাবারের ব্যবস্থা করে দিত, খবরের কাগজ এনে দিত এবং সান্তিয়াগোর সাথে মনের সুখে আমেরিকান বাস্কেটবল খেলার গল্প করত পুরাতন পেপার থেকে ।
খুব ছোট্ট একটা গল্প হলেও লেখক মনে হয়ে গল্পটিকে টেনে অনেক বেশিই বড় করে ফেলেছেন । তবে এই দীর্ঘ বর্ণনা পড়েই বুঝা যায় যে সাগর, জেলেদের জীবন এবং তাদের মাছধরা পেশা সম্পর্কে লেখকের অসাধারণ জ্ঞান রয়েছে । লেখক মাছ ধরার বিভিন্ন উপদানসহ বিভিন্ন কৌশলও সুনিপুনভাবে বর্ণনা করেছেন সমগ্র উপন্যাসিকাজুরে । এছাড়াও রয়েছে মন কেড়ে নেবার মত কিছু লাইন । যেমনঃ
“হার মেনে নেবার জন্য মানুষের জন্ম হয়নি, মানুষকে ধ্বংস করা যায় কিন্তু পরাস্ত করা যায় না ।”
এই উক্তিটি ছিল সান্তিয়াগোর নিজের সাথে নিজের কথা বলার মাঝে । আবার বিশাল মারলিন মাছের প্রতিও একটি চমৎকার উক্তি ছিল সান্তিয়াগোর । যেমনঃ
“তোমাকে আমি ভালোবাসি তাই তোমাকে আমার হত্যা করতে হবে ।”
সাগর জীবনের নানান বর্ণনা ছাড়াও এই গল্পে তুলে ধরা হয়েছে মানব জীবনের আসল উদ্দেশ্য- জীবন যুদ্ধ করা, মানব সম্প্রদায় এবং প্রকৃতির মাঝের সম্পর্ক, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, জীবনের প্রতি ভালোবাসা । আর প্রচণ্ডভাবে উঠে এসেছে হার না মানা এক বৃদ্ধ জেলের গল্প যা আমাদের শিক্ষা দিয়ে থাকে অনেক কিছুই ।

Add Comment

Required fields are marked *. Your email address will not be published.

15 + 17 =