তিস্তা পানিবন্টন চুক্তিঃ ইতিহাস ও পর্যালোচনা

৩৬তম বিসিএস লিখিত প্রস্তুতি
…………………………………….
তিস্তা পানিবন্টন চুক্তিঃ ইতিহাস ও পর্যালোচনা
ভূমিকাঃ
সৌজনে্য >>Wahedunnabi Parvez
*কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে চাষাবাদের ক্ষেত্রে সেচের ভূমিকা অপরিসীম আর বাংলাদেশে নদীভিত্তিক যেচ প্রকল্পের ক্ষেত্রে তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্প একটি সফল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান অধিদপ্তরের ২০০১ সালের তথ্যমতে, এই দেশের মোট জনসংখ্যার ৮.৫ শতাংশের আবাসস্থল তিস্তা অববাহিকায় রয়েছে মোট আবাদি জমির শতকরা ১৪ ভাগ।*
*এই অববাহিকার শতকরা ৬৩ ভাগ আবাদি জমি সেচের আওতাধীন, যেখানে দেশের গড় সেচ-আবাদি জমির শতকরা হার ৪২। সেচের পানির প্রাপ্যতা এই অঞ্চলে বছরে দুটি ফসল ঘরে তোলার সুযোগ করে দিয়েছিল। কৃষিতে উন্নতি এই অঞ্চলের কৃষক-শ্রমিকের জীবনযাত্রার মানে প্রভাব পড়েছিল।*
*শুরুতে পরিকল্পনায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের দুটি ফেইজ ছিল, যার মধ্যে ফেইজ-১ সম্পন্ন হয়েছে যা মূলত রংপুর ও নীলফামারী জেলায় সেচের সুবিধা দিচ্ছে। দ্বিতীয় ফেইজে পরিকল্পনা ছিল দিনাজপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও জয়পুরহাটকে অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু ভারতের গজলডোবায় ব্যরেজ নির্মানের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশে তিস্তায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়াতে সেই পরিকল্পনা এখন হুমকির সম্মুখীন। এই মূহুর্তে তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি তাই বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ।*
পানিবন্টন আলোচনার ইতিহাসঃ
*১৯৭২ সালে আন্তঃসীমান্ত নদীসমুহের উন্নয়নের দিককে সামনে রেখে ভারত বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন (জ়েআরসি) প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকেই তিস্তা নদীর পানি বন্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ।।১৯৮৩ সালে তিস্তা নদীর ভারতীয় অংশে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা ও বাংলাদেশ অংশে লালমনিরহাটের দোয়ানীতে প্রায় একই সময় গ্রীষ্মকালীন সেচের জন্য ব্যারেজ নির্মান কাজ শুরু হলে তিস্তার পানিবন্টন নিয়ে আলোচনা অধিক গুরুত্ত্বের সাথে বিবেচিত হতে থাকে*
*পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে ১৯৮৩ সালে যৌথ নদী কমিশনের ২৫ তম বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারত তিস্তার পানি বন্টনের জন্য একটি এডহক চুক্তি করার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল বলে জানা যায়। সেসময় তিস্তার মোট প্রবাহের ২৫% কে অবন্টনকৃত রেখে বাকী ৭৫% শতাংশ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্টন করার প্রস্তাব করা হয়েছিল যেখানে বাংলাদেশের হিস্যা ছিল ৩৬% আর ভারতের ছিল ৩৯%।তবে এই বন্টন কোথায় এবং কি পদ্ধতিতে হবে সেটি নিয়ে দ্বিমতের জের ধরে সেই এডহক চুক্তিটি বাস্তবের দেখা পায়নি। *
দুই পক্ষের প্রস্তাবঃ
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যৌথ নদী কমিশনের সভায় এই হিস্যা সমূহের জন্য তিনটি প্রথম উত্থাপনের চিন্তা ভাবনা করা হয়ঃ
প্রস্তাব ১ : ভারতের গজলডোবায় লব্ধ পানির শতকরা ২০ ভাগ নদীখাত সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকবে, আর বাকি শতকরা ৮০ ভাগ পানি বাংলাদেশ ও ভারত সমভাবে ভাগ করে নেবে।
প্রস্তাব ২ : ভারতের গজলডোবায় লব্ধ পানির শতকরা ২০ ভাগ নদীখাত সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকবে, আর বাকি শতকরা ৮০ ভাগ পানি ১৯৮৩ সালে প্রস্তাবিত এডহক চুক্তি অনুযায়ী ৩৬:৩৯ অনুপাতে বাংলাদেশ ও ভারত ভাগ করে নেবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ পাবে ৩৮ শতাংশ আর ভারত পাবে ৪২ শতাংশ।
প্রস্তাব ৩ : ভারতের গজলডোবায় লব্ধ পানির শতকরা ১০ ভাগ নদীখাত সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকবে, আর বাকি শতকরা ৯০ ভাগ পানি ১৯৮৩ সালের এডহক চুক্তি অনুযায়ী ৩৬:৩৯ অনুপাতে বাংলাদেশ ও ভারত ভাগ করে নেবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ পাবে ৪৩ শতাংশ আর ভারত পাবে ৪৭ শতাংশ।
*এখানে উল্লেখ্য যে বাংলাদেশ মূলত প্রথম প্রস্তাবটিই যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে উত্থাপন করে। কিন্তু এই প্রস্তাব নিয়ে ভারত সম্মত না হওয়ায় বাকী দুটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এগোয়নি। এর বিপরীতে ভারতের যুক্তি ছিল কিছুটা একপেশে। ভারত প্রস্তাব করে নদীর জন্য ১০ শতাংশ পানি রেখে বাকী ৯০ শতাংশ পানি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সেচ প্রকল্প এলাকার ভিত্তিতে বন্টন করার। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে ভারতের গজলডোবায় প্রকল্প এলাকা (৫.৪৬ লক্ষ) আর বাংলাদেশের দোয়ানীতে প্রকল্প এলাকার (১.১১ লক্ষ )অনুপাত ৫:১। সুতরাং ভারতের প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলাদেশের হিস্যা দাড়ায় ১৫ শতাংশ আর ভারতের ৭৫ শতাংশ।*
নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে ব্যবচ্ছেদঃ
এপর্যায়ে বাংলাদেশের প্রস্তাব সমুহের একটি ব্যবচ্ছেদ করা যাক। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বয়ে যাওয়া অর্ধশতাধিক নদ-নদী থাকলেও আজ পর্যন্ত সফল পানিবন্টন চুক্তি হয়েছে একমাত্র গঙ্গার ক্ষেত্রে। আর গঙ্গাচুক্তিতেই যেহেতু অন্যান্ন আন্তসীমান্ত নদীসমূহের চুক্তির ব্যাপারে একক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে একমত হবার ধারাটি রয়েছে তাই ভারতের সাথে যেকোন পানিবন্টনের খসড়াতে গঙ্গা চুক্তির অনুকরণ যৌক্তিক বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। এবারে দেখি গঙ্গা চুক্তিতে ফারাক্কায় পানিবন্টন কি অনুপাতে করা হয়েছেঃ
১) ফারাক্কায় পানির প্রবাহ ৭০,০০০ কিউসেক (১ কিউসেক=সেকেন্ড ১ ঘনফুট) এর কম হলে ভারত ও বাংলাদেশের হিস্যার অনুপাত ১:১ বা বাংলাদেশ ৫০% ও ভারত ৫০%
২) ফারাক্কায় পানির প্রবাহ ৭০,০০০-৭৫,০০০ কিউসেকের মধ্যে হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫,০০০ কিউসেক আর ভারত পাবে বাদবাকী। এক্ষেত্রে হিস্যর অনুপাত ১:১ থেকে ৮:৭ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে অর্থাৎ এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ন্যুনতম হিস্যা দাঁড়ায় ৪৭%।
৩) ফারাক্কায় পানির প্রবাহ ৭৫,০০০ কিউসেকের উপরে মধ্যে হলে ভারত পাবে ভারত পাবে ৪০,০০০ কিউসেক আর বাংলাদেশ পাবে বাদবাকী। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ন্যুনতম হিস্যা দাঁড়ায় ৪৭%।
অর্থাৎ গঙ্গা চুক্তিতে বাংলাদেশের ন্যুনতম হিস্যা ছিল ৪৭%। সেই বিচারে তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রথম প্রস্তাবে নদীখাতের জন্য শতকরা ২০ ভাগ পানি বরাদ্ধ রেখে বাকী ৮০ ভাগ পানি ৪০ শতাংশ করে সমভাগে ভাগ করে নেয়ার যুক্তি কোনমতেই উচ্চাভিলাষী বলে বিবেচিত হয়না। সেই সাথে বাংলাদেশের তৃতীয় প্রস্তাব অর্থাৎ শতকরা ১০ ভাগ নদীখাত সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ রেখে বাকি শতকরা ৯০ ভাগ পানি ১৯৮৩ সালের এডহক চুক্তি অনুযায়ী ৩৬:৩৯ অনুপাতে বাংলাদেশ ও ভারত ভাগ করে নেয়ার প্রস্তাব প্রকারান্তরে ভারতের প্রতি বাংলাদেশে বন্ধুভাবাপন্ন মতাদর্শের পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত
আমাদের করণীয়ঃ
তিস্তার পানিবন্টন নিয়ে একটি সফল সমাপ্তির ক্ষেত্রে আপস আলোচনার বিকল্প নেই।তবে সফল আপস আলোচনার জন্য সমস্যা সমাধানের মানসিকতা থাকতে হবে।
তবে যেহেতু দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা চুক্তির অনুচ্ছেদ ৯ উল্লেখ আছে ‘পক্ষপাতবিহীন ও সাম্যতাপ্রসূত এবং কোনো পক্ষেরই ক্ষতি না করে দুই সরকারই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বহমান অন্যান্য আন্তসীমান্ত নদীসমূহের চুক্তির ব্যাপারে একক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে একমত’, সেক্ষেত্রে সাম্যতা বজায় রেখে ও শুধু একপক্ষের ক্ষতি সাধন না করে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন করা দুই দেশের জন্যই কিছুটা বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে পড়ে।
দুটি প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারেঃ
প্রস্তাব ১: ২০% হিস্যা নদীখাতের জন্য বরাদ্দ রেখে বাকী ৮০% পানি ভারত ও বাংলাদেশের সেচ প্রকল্পের পরিকল্পিত এলাকার ভিত্তিতে (ভারত কতৃক উত্থাপিত বাস্তবায়িত এলাকার ভিত্তিতে নয়) বন্টন করার কথা প্রস্তাব করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ১৭:১০ অনুপাতে বাংলাদেশের হিস্যা হবে ৩০% ও ভারতের ৫০%। নদীখাতের জন্য ছেড়ে দেয়া পানি যেহেতু মূলত বাংলাদেশে প্রবেশ করবে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট হিস্যা দাড়াবে ৫০% আর ভারতের ৫০%।
প্রস্তাব ২: ১০% হিস্যা নদীখাতের জন্য বরাদ্দ রেখে বাকী ৯০% পানি ভারত ও বাংলাদেশের সেচ প্রকল্পের পরিকল্পিত এলাকার ভিত্তিতে (ভারত কতৃক উত্থাপিত বাস্তবায়িত এলাকার ভিত্তিতে নয়) বন্টন করার কথা প্রস্তাব করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ১৭:১০ অনুপাতে বাংলাদেশের হিস্যা হবে ৩৪% ও ভারতের ৫৬%। নদীখাতের জন্য ছেড়ে দেয়া পানি যেহেতু মূলত বাংলাদেশে প্রবেশ করবে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট হিস্যা দাড়াবে ৪৪% আর ভারতের ৫৬%।
এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে শতকরা কতভাগ পানি নদীখাতের জন্য বরাদ্দ থাকলে তা নৌচলাচল, শিল্পকারখানা সহ মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে সহায়ক হবে সে বিষয়ক তথ্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের থাকা উচিত। সেই মোতাবেক উপরের প্রস্তাব দুটিকে পরিবর্তন করা যেতে পারে।পরিশেষে আশা করি সফল কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে উপনীত হবে, রক্ষা পাবে আমাদের গর্ব তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প আর সেইসঙ্গে আশার আলো দেখবে তিস্তার ওপর নির্ভরশীল উত্তরবঙ্গের মঙ্গাপীড়িত মানুষ

Add Comment

Required fields are marked *. Your email address will not be published.

seventeen + 4 =